হাওজা নিউজ এজেন্সি: কোমে জুমার নামাজের খুতবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রতিরোধ ফ্রন্ট, আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং ‘ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ার’-এর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন আয়াতুল্লাহ আরাফি।
খুতবায় শুরুতেই আয়াতুল্লাহ আল-উজমা শুবাইরি জাঞ্জানির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন তিনি এবং তাঁর ফিকহি, জ্ঞানগত ও হাওজাভিত্তিক অবদানের প্রশংসা করেন। ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ’ উপলক্ষে আট বছরের প্রতিরক্ষা যুদ্ধে শহীদদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর সেবা ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করেন তিনি।
হিজাব ও শালীনতাসহ সামাজিক বিষয়ে গুরুত্বারোপ
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা সমাধানে পুলিশের উচিত জিহাদি, বিপ্লবী ও জ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে হিজাব ও শালীনতা রক্ষা এবং সামাজিক অনাচার মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, কোম হযরত ফাতেিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর মাজার এবং জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই শহরটির ধর্মীয় ও নৈতিক পরিচয় রক্ষায় জনগণ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মেধাবী তরুণরাই দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি
দেশের মেধাবী তরুণ ও বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব তুলে ধরে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, তারা দেশের মৌলিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত মেধাবী তরুণদের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করা এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নৈতিকতা, সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতিতে তাদের সক্ষমতা কাজে লাগানো।
তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা ও সামরিক ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গনে ইরানি তরুণদের অসাধারণ সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তাই জ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তাদের সক্ষমতাকে আরও বিকশিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে ‘ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ার’
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, বর্তমান সময়ে যুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; ‘ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ার’ বা বয়ানের যুদ্ধও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। শত্রুপক্ষ হাজারো গণমাধ্যমের মাধ্যমে যুদ্ধের বাস্তবতা ও এর বিভিন্ন দিক নিজেদের মতো করে উপস্থাপনের চেষ্টা করে।
এ কারণে প্রকৃত ঘটনা অনুধাবনের জন্য জনগণের মধ্যে দূরদর্শিতা, দৃঢ়তা ও শক্তিশালী চিন্তাগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের কথাও উল্লেখ করেন আয়াতুল্লাহ আরাফি। তাঁর মতে, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ধারণায় পরিবর্তন এনেছে এবং বিশ্বের সামনে তাদের কর্মকাণ্ডের আরও কিছু দিক স্পষ্ট করেছে।
ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ড ও বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি কয়েকটি পশ্চিমা ও আঞ্চলিক সরকারের ভূমিকারও সমালোচনা করেন।
আরব নেতাদের উদ্দেশে আরাফি: মুসলিম জাতি সবকিছু মনে রাখবে
ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতার সমালোচনা করে আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানির মধ্যেও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ও চুক্তি করা মুসলিম বিশ্বের জন্য দুঃখজনক।
তিনি বলেন, মুসলিম জনগণ এসব পদক্ষেপ ভুলে যাবে না এবং একদিন সংশ্লিষ্ট নেতাদের তাদের ভূমিকা সম্পর্কে জবাব দিতে হবে।
ইরান সরাসরি সংঘাতের ভয় কাটিয়েছে
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে এক ধরনের ভয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানি জনগণ দেখিয়েছে, নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মোকাবিলায় দাঁড়াতে পারে।
তাঁর মতে, এ যুদ্ধ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, অতীতে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইরান কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করেছে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর সেই কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে দেশটি তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে জবাব দেবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আয়াতুল্লাহ আরাফি বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের শক্তির নতুন কিছু দিক সামনে এসেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদাবসহ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানগুলোর গুরুত্বও আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, শত্রু যদি আবার হামলা চালায়, তাহলে ইরানের কাছে আরও কিছু পদক্ষেপ ও সক্ষমতা রয়েছে, যা প্রয়োজন হলে ব্যবহার করা হবে।
তাকওয়া শয়তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ঢাল
প্রথম খুতবায় আয়াতুল্লাহ আরাফি নিজেকে ও সব মুসল্লিকে তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শয়তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাকওয়া মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী ঢাল।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানি জনগণ ঐক্য, ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। সম্মান ও মর্যাদা, ধৈর্য-সহনশীলতা এবং দূরদর্শিতা ইরানি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং সামাজিক পর্যায়ে প্রতিরোধের চেতনাও সংকট মোকাবিলায় জাতিকে দৃঢ় থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আপনার কমেন্ট